নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফলে দেখা যায়, ড. রেজা কিবরিয়া ধানের শীষ প্রতীকে প্রায় ১ লাখ ১১ হাজারের বেশি ভোট পেয়ে জয়লাভ করেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী খেলাফত মজলিশের মাওলানা সিরাজুল ইসলাম মিরপুরী রিকশা প্রতীকে প্রায় ৫৫ হাজার ভোট পান। এছাড়া বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী শেখ সুজাত মিয়া ঘোড়া প্রতীকে প্রায় ৩৪ হাজার ভোট, ইসলামিক ফ্রন্টের বদরুর রেজা সেলিম চেয়ার প্রতীকে পাঁচ হাজারের বেশি এবং বাংলাদেশ বাসদের কাজী তোফায়েল আহমদ মোটরগাড়ি প্রতীকে কয়েকশ ভোট পান। এ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ছিল ৪ লাখ ৬১ হাজারের বেশি এবং ভোট প্রদানের হার ছিল প্রায় ৪৫ দশমিক ৮৯ শতাংশ।
নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর নবীগঞ্জ ও বাহুবলের বিভিন্ন এলাকায় আনন্দ মিছিল, মিষ্টি বিতরণ এবং শুভেচ্ছা বিনিময়ের মধ্য দিয়ে বিজয় উদযাপন করা হয়। দলীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে এলাকায় উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়। স্থানীয় জনগণের মধ্যে নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে যে, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হিসেবে তিনি এলাকার উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, অবকাঠামো এবং সামাজিক অগ্রগতিতে কার্যকর ভূমিকা রাখবেন।
ড. রেজা কিবরিয়ার বিজয়ে দিনারপুর পরগনার ভোটারদের ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে। নবীগঞ্জ উপজেলার দেবপাড়া, গজনাইপুর, পানিউমদা ও পুটিজুরি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত দিনারপুর পরগনা দীর্ঘদিন ধরেই নির্বাচনে ঐক্যবদ্ধ অবস্থানের জন্য পরিচিত। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, এ অঞ্চলের কোনো প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নিলে দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে তাকে বিজয়ী করার চেষ্টা করেন এলাকাবাসী। ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের আগেও দিনারপুরবাসী এক সর্বদলীয় সভায় অংশ নিয়ে “দল যার যার, রেজা সবার” স্লোগানে ঐক্যমত গঠন করেন এবং নির্বাচনে সেই সিদ্ধান্তের বাস্তব প্রতিফলন দেখা যায়।
ভোটের ফলাফলে দিনারপুর এলাকার বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে বিপুল ব্যবধানে ধানের শীষ প্রতীকের জয় লক্ষ্য করা গেছে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ওই এলাকায় মোট কাস্টিং ভোটের প্রায় ৮০ শতাংশ রেজা কিবরিয়া পেয়েছেন। বিভিন্ন কেন্দ্রে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের তুলনায় তাঁর ভোটের ব্যবধান ছিল উল্লেখযোগ্য। দিনারপুরের এই ঐক্যবদ্ধ ভোট শুধু ব্যবধান বাড়ায়নি, বরং পুরো নির্বাচনী ফলাফলেও প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিরা জানান, দিনারপুর পরগনার মানুষ অতীতেও একাধিক নির্বাচনে একই ধরনের ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নিয়েছেন। এ এলাকার সন্তান হিসেবে এর আগে মন্ত্রী ছিলেন দেওয়ান ফরিদ গাজী এবং প্রয়াত অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়া। এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, রেজা কিবরিয়াকে মন্ত্রী করা হলে দিনারপুর পরগনা থেকে তৃতীয়বারের মতো একজন মন্ত্রী পাবেন তারা। নবীগঞ্জ ও বাহুবলের বিভিন্ন এলাকায় ইতোমধ্যে তাঁকে মন্ত্রী করার দাবি উঠেছে। স্থানীয় নেতাকর্মী ও জনপ্রতিনিধিদের মতে, তিনি নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠিত হলে মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
দলীয় সূত্রেও এ বিষয়ে আলোচনা চলছে বলে জানা গেছে। বিষয়টি নির্ভর করছে দলের শীর্ষ নেতৃত্বের সিদ্ধান্তের ওপর, বিশেষ করে তারেক রহমান-এর নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল সরকারের মন্ত্রিসভা গঠনের ওপর। তবে এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে ড. রেজা কিবরিয়া কৌশলী অবস্থান নিয়েছেন। তিনি বলেন, জনগণ তাঁকে ঐক্যবদ্ধভাবে ভোট দিয়েছেন তাদের উন্নয়নের জন্য এবং তিনি সেই প্রত্যাশা পূরণে কাজ করবেন। মন্ত্রিত্বের বিষয়টি দলের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
এই নির্বাচনে তাঁর বিজয়ের পেছনে সহধর্মিণী সিমি কিবরিয়ার ভূমিকা বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে। নির্বাচনী প্রচারণার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তিনি মাঠে থেকে গণসংযোগ, নারী ভোটারদের সঙ্গে মতবিনিময়, সামাজিক ও পারিবারিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে প্রার্থীর পক্ষে জনমত গড়ে তুলতে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। স্থানীয়দের মতে, তাঁর নিরলস প্রচেষ্টা ও সাংগঠনিক সম্পৃক্ততা নির্বাচনী সাফল্যে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে।
বিজয়ের পর তিনিও এলাকাবাসীর সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করেন। বিজয়োত্তর প্রতিক্রিয়ায় ড. রেজা কিবরিয়া ভোটারদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, জনগণের প্রত্যাশা পূরণই হবে তাঁর প্রধান অঙ্গীকার। তিনি উন্নয়ন, সুশাসন ও জবাবদিহিতামূলক রাজনীতি প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি আরও বলেন, জনগণের আস্থা ধরে রাখতে তিনি সততা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করবেন।
উল্লেখ্য, ড. রেজা কিবরিয়া দেশের একজন প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ এবং প্রয়াত অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়ার সন্তান। নির্বাচনের আগে তিনি দলীয় নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠক করে বিএনপিতে যোগ দেন এবং দলীয় মনোনয়ন লাভ করেন। ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যেও ব্যাপক প্রচারণা ও সাংগঠনিক তৎপরতার মাধ্যমে তিনি এ বিজয় অর্জন করেন।
এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, তাঁর পিতার অসমাপ্ত উন্নয়ন পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমে হবিগঞ্জ-১ আসনে অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে দৃশ্যমান পরিবর্তন আসবে। পাশাপাশি নবীগঞ্জ ও বাহুবল এলাকায় উন্নয়নের নতুন ধারা সৃষ্টি হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন স্থানীয়রা।
