পাশাপাশি চরম হুমকির মুখে পড়ছে পরিবেশ ও প্রকৃতি। সংশ্লিষ্ট ও স্থানীয়দের মতে, লাখাইয়ের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি কৃষি। উপজেলার প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। অথচ শীত মৌসুম এলেই কোনো ধরনের বাধা ছাড়াই শুরু হয় আবাদি জমির টপ সয়েল কাটার মহোৎসব।
লাখাই উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের নানা স্থানে ফসলি জমির মাটি কাটা চলছে। এর ফলে জমির মাঝখানে তৈরি হচ্ছে বড় বড় গর্ত। কোথাও একাংশ মাটি কেটে নেওয়ায় পাশের জমিও দেবে যাচ্ছে। এসব মাটি অনুমোদনহীন ট্রাক্টর ও ট্রলির মাধ্যমে ইটভাটা ও অন্যান্য কাজে সরবরাহ করা হচ্ছে। এতে সামান্য বৃষ্টিতেই এলাকার রাস্তাঘাট চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, আবাদি জমির মূল পুষ্টিগুণ থাকে ওপরের ৬ থেকে ৮ ইঞ্চি মাটির স্তরে। এই স্তর কেটে নেওয়া হলে জমির উর্বরতা কার্যত নষ্ট হয়ে যায়। ফলে উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি মাটি কাটা জমিতে চাষাবাদের খরচ কয়েক গুণ বেড়ে যায়।
১ নম্বর লাখাই ইউনিয়নের কৃষক জয়নাল মিয়া বলেন, টপ সয়েল বিক্রি করে তাৎক্ষণিকভাবে কিছু টাকা পাওয়া গেলেও এর ক্ষতি দীর্ঘমেয়াদি। পরিবেশবিদদের মতে, টপ সয়েল কাটার ফলে শুধু একটি জমিই নয়, আশপাশের জমির উৎপাদন ক্ষমতাও কমে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে রাস্তাঘাট ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তৈরি হচ্ছে গভীর গর্ত। পাশাপাশি ইটভাটার কালো ধোঁয়ায় ফসলেরও ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে।
উল্লেখ্য, লাখাই উপজেলায় রাতের আঁধারে অবৈধভাবে মাটি উত্তোলনের দায়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে জরিমানা ও সরঞ্জাম জব্দ করা হয়েছে। গত সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) দিবাগত রাত ১টার দিকে উপজেলার লাখাই ইউনিয়নের আমানুল্লাহপুর এলাকায় এ অভিযান পরিচালিত হয়।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, আমানুল্লাহপুর এলাকায় একটি চক্র দীর্ঘদিন ধরে সরকারি নিয়মনীতি উপেক্ষা করে ড্রেজার মেশিনের মাধ্যমে অবৈধভাবে মাটি উত্তোলন করে আসছিল। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে লাখাই থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মুন্না মিয়ার নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থলে অভিযান চালায়।
অভিযানকালে মাটিকাটার কাজে ব্যবহৃত স্থানীয় মেলু মিয়ার মালিকানাধীন দুটি মাটিবাহী ট্রলি জব্দ করা হয়। পরে ঘটনার সত্যতা যাচাই করে লাখাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ মুরাদ ইসলাম ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন। এ সময় অবৈধভাবে মাটি উত্তোলনের দায়ে সংশ্লিষ্টদের ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
উপজেলা প্রশাসন জানায়, অবৈধভাবে বালু বা মাটি উত্তোলন পরিবেশ ও রাস্তাঘাটের জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ। জনস্বার্থ ও সরকারি সম্পদ রক্ষায় এ ধরনের অভিযান ভবিষ্যতে আরও জোরদার করা হবে। অপরাধী যেই হোক, তাকে আইনের আওতায় আনা হবে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মতে, কৃষিজমির টপ সয়েল কাটা অত্যন্ত ক্ষতিকর। একবার জমির ওপরের উর্বর মাটি নষ্ট হলে তা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে ১০ থেকে ১৫ বছর সময় লাগে। এতে শুধু জমিই নয়, পুরো কৃষি ব্যবস্থাই মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
