দখল-দূষণে করাঙ্গীর করুণ পরিণতি শুকিয়ে যাওয়া নদীতে জীবিকার সংকট

একসময় যে নদীর গর্জনে কেঁপে উঠত জনপদ, আজ সেখানে নেমে এসেছে নিস্তব্ধতা। বাহুবল উপজেলার বুক চিরে বয়ে চলা প্রাণবন্ত করাঙ্গী নদী এখন যেন হারানো দিনের স্মৃতি। যে নদী ছিল হাজারো কৃষক, জেলে ও সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকার অবলম্বন, আজ তা শুকিয়ে পড়ে আছে বিস্তীর্ণ বালুচর আর ফেটে যাওয়া মাটির স্তরে। স্থানীয় প্রবীণদের ভাষ্য, একসময় বর্ষা এলে করাঙ্গী নদী ছিল দুর্দান্ত স্রোতস্বিনী। নদীর উত্তাল ঢেউ আর পানির গর্জন জানান দিত তার শক্তি ও প্রাচুর্যের কথা। শুকনো মৌসুমেও নদীতে থাকত পর্যাপ্ত পানি, যা দিয়ে চলত সেচকাজ, মাছ ধরা, নৌকা চলাচল এবং নিত্যদিনের গৃহস্থালি প্রয়োজন। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় সেই নদী আজ সংকুচিত, দখলদারিত্ব আর দূষণের কবলে পড়ে মৃতপ্রায়। নদীর বুক জুড়ে এখন কেবল ধুলোমাখা মাটি, কোথাও কোথাও আগাছা আর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা আবর্জনা।

স্থানীয়দের অভিযোগ, উজানে অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণের ফলে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় নদী তার স্বাভাবিক গভীরতা ও প্রশস্ততা হারিয়েছে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে ময়লা-আবর্জনা ফেলা এবং শিল্পকারখানার বর্জ্য নদীতে মিশে পানিকে দূষিত করেছে।

এক বাসিন্দা আক্ষেপ করে বলেন, “নদী ছিল আমাদের প্রাণ। এখন নদীর বুক চিরে শুধু মাটি দেখা যায়। পানি নেই, মাছ নেই, আছে শুধু হতাশা।”

করাঙ্গী নদীর বড় একটি অংশ স্থানীয়ভাবে জবরদখলের শিকার হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। নদীর দুই পাড় ভরাট করে গড়ে উঠেছে স্থাপনা ও চাষের জমি। ফলে প্রাচীন প্রশস্ত নদী আজ অনেক জায়গায় সরু নালার মতো হয়ে গেছে। স্রোতের তীব্রতা হারিয়ে যাওয়ায় নদীর স্বাভাবিক স্বশোধন ক্ষমতাও কমে গেছে। এতে কলকারখানার বিষাক্ত রাসায়নিক, প্লাস্টিক ও গৃহস্থালি বর্জ্য জমে থেকে পানিকে করেছে ভারী ও দুর্গন্ধময়। এর প্রভাব পড়েছে নদীর জীববৈচিত্র্যের ওপর, কমে গেছে দেশি মাছের প্রজাতি, বিলীন হচ্ছে জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণী।

নদী শুকিয়ে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে কৃষিক্ষেত্রে। আগে নদীর পানি দিয়ে সেচ দেওয়া সম্ভব হলেও এখন কৃষকদের নির্ভর করতে হচ্ছে গভীর নলকূপের ওপর। এতে ব্যয় বেড়েছে, কমেছে উৎপাদন। অনেক জেলে পেশা বদলাতে বাধ্য হয়েছেন।

স্থানীয়দের মতে, শুধু নদী নয়, এলাকার পুকুর, খাল-বিলও ধীরে ধীরে শুকিয়ে যাচ্ছে। পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় দেখা দিয়েছে নতুন সংকট।

অভিযোগ রয়েছে, নদী খনন বা দখলমুক্ত করতে কার্যকর ও টেকসই কোনো উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়। মাঝে মাঝে আলোচনা হলেও বাস্তবে দৃশ্যমান পদক্ষেপের অভাব রয়েছে। সচেতন মহল মনে করছেন, দ্রুত নদী পুনঃখনন, দখলমুক্তকরণ, উজানের পানি ব্যবস্থাপনায় সমন্বয় এবং দূষণ নিয়ন্ত্রণে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে করাঙ্গী নদী একসময় মানচিত্রেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে। করাঙ্গী নদীর বর্তমান চিত্র যেন আমাদের সামনে এক কঠিন বার্তা তুলে ধরে, প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা না করলে তার শক্তি, সৌন্দর্য ও উপকারিতা কেবল স্মৃতির পাতায় ঠাঁই নেবে। এখনই যদি সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া না হয়, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হয়তো নদীর গর্জন নয়, শুধু গল্পই শুনবে।



শেয়ার করুন