চুনারুঘাটে প্রশাসনের অভিযানেও থেমে নেই অবৈধভাবে বালু উত্তোলন ॥ পরিবেশ ধ্বংস

চুনারুঘাট উপজেলার বিভিন্ন নদী, ছড়া ও খাল থেকে দীর্ঘদিন ধরে অবাধে অবৈধ বালু উত্তোলন চলছে। সরকারি বিধিনিষেধ ও বালুমহাল আইন উপেক্ষা করে প্রভাবশালী একটি চক্র ড্রেজার মেশিন ব্যবহার করে দিন-রাত বালু উত্তোলন করছে। এসব বালু উপজেলার বিভিন্ন স্থানে ডিপো করে বিক্রি করা হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে গ্রামীণ সড়ক, কৃষিজমি ও জনজীবন। সম্প্রতি উপজেলা প্রশাসনের ধারাবাহিক অভিযানে জরিমানা, পাইপ ও যন্ত্রপাতি ধ্বংস করা হলেও অবৈধ কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। এদিকে অবৈধ বালু ও মাটি উত্তোলনের বিরুদ্ধে উপজেলা প্রশাসন সম্প্রতি অভিযান জোরদার করেছে। গত ২০ জুন চুনারুঘাট উপজেলার মিরাশি ইউনিয়নের নালমুখ বাজার সংলগ্ন এলাকায় অনুমতি ছাড়া মাটি উত্তোলন ও পরিবহনের দায়ে আলী সায়েদ নামে এক ব্যক্তিকে ৭৫ হাজার টাকা অর্থদণ্ড প্রদান ও আদায় করা হয়। একই সঙ্গে সেখানে ব্যবহৃত প্রায় ২০০ ফুট পাইপ বিনষ্ট করা হয়।

পরে দারাগাঁও টি এস্টেট সংলগ্ন দারাগাঁও গ্রামের একটি ছড়ায় অবৈধভাবে মেশিন ব্যবহার করে বালু উত্তোলনের অভিযোগ পেয়ে মোবাইল কোর্ট অভিযান পরিচালনা করে। ঘটনাস্থলে পৌঁছামাত্র বালু উত্তোলনে জড়িত ব্যক্তি প্রশাসনের উপস্থিতি টের পেয়ে ছড়ার ভেতর দিয়ে জঙ্গলে পালিয়ে যান। পরে সেখানে ব্যবহৃত মেশিন ও পাইপ ধ্বংস করা হয়। এছাড়া যন্ত্রপাতি পরিবহনে ব্যবহৃত একটি টমটম গাড়ি এবং প্রায় ১০০ ফুট পাইপ জব্দ করা হয়। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা গালিব চৌধুরী বলেন, অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে। সম্প্রতি কয়েকজনকে জেল-জরিমানা করা হয়েছে এবং বালু উত্তোলনে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি জব্দ ও ধ্বংস করা হয়েছে। জনস্বার্থ ও পরিবেশ রক্ষায় এ অভিযান ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।

তবে স্থানীয়দের দাবি, মাঝে মধ্যে অভিযান পরিচালনা করলেই হবে না, অবৈধ বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত প্রভাবশালী চক্রকে চিহ্নিত করে স্থায়ীভাবে এই কার্যক্রম বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্যথায় চুনারুঘাটের নদী-ছড়া, পরিবেশ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও ভয়াবহ ক্ষতির মুখে পড়বে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ইজারাকৃত নির্ধারিত ঘাটের বাইরে বালু উত্তোলন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হলেও উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রকাশ্যে এই কার্যক্রম চলছে। গাজীপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজের সামনে, কাচুয়া বাজার সংলগ্ন এলাকা, রাজারবাজারের বাঁশতলা এবং আরও কয়েকটি স্থানে রাস্তার পাশে বালুর বিশাল স্তূপ দেখা যায়। এসব স্থান থেকে প্রতিদিন ট্রাক্টর ও অন্যান্য যানবাহনের মাধ্যমে বালু বিক্রি ও পরিবহন করা হচ্ছে।

অভিযোগ রয়েছে, চন্ডিছড়া চা বাগানের ছড়া, করাঙ্গী নদীর কুরছিমুড়া, চান্দের টিলা, কোনাগাঁও এলাকা এবং সুতাং নদীর বিভিন্ন অংশ থেকে নিয়মিত বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। বিশেষ করে সুতাং নদীর বদরগাজী এলাকায় কোনো বৈধ ইজারা না থাকলেও সেখানে বালু উত্তোলন অব্যাহত রয়েছে। ফলে নদী ও ছড়ার স্বাভাবিক গতিপ্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে। নদীর তীর ভাঙন বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং বিভিন্ন এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা হুমকির মুখে পড়েছে। চন্ডিছড়া চা বাগান এলাকার ছড়া থেকে অতিরিক্ত বালু উত্তোলনের কারণে সড়ক ভেঙে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে।

এদিকে বালুবাহী ট্রাক্টর ও ভারী যানবাহনের বেপরোয়া চলাচলে উপজেলার অধিকাংশ গ্রামীণ সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অতিরিক্ত ওজন বহনকারী যানবাহনের কারণে সড়কে বড় বড় গর্ত ও খানাখন্দ সৃষ্টি হয়েছে। এতে সাধারণ মানুষের চলাচলে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

একজন পরিবেশবিদ জানান, চুনারুঘাটে এমন কোনো সড়ক খুঁজে পাওয়া কঠিন, যেখানে বালুবাহী যানবাহনের কারণে ক্ষতি হয়নি। বালুমহাল থেকে সরকার যে পরিমাণ রাজস্ব পায়, তার চেয়েও বেশি অর্থ সড়ক সংস্কারে ব্যয় করতে হচ্ছে। পরিবেশ ও জনস্বার্থে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।



শেয়ার করুন