বাজেট বুঝেন না চা শ্রমিকরা, তবু প্রত্যাশা জীবনমান উন্নয়নের

জাতীয় বাজেট নিয়ে যখন দেশজুড়ে চলছে আলোচনা-সমালোচনা, তখন হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার পাঁচটি চা বাগানের অধিকাংশ শ্রমিকের কাছে বাজেট যেন এক অপরিচিত বিষয়। রাষ্ট্রের আয়-ব্যয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত দলিল সম্পর্কে তাদের জানাশোনা সীমিত। দৈনন্দিন জীবনের সংগ্রাম, সংসারের খরচ আর মজুরি নিয়েই তাদের প্রধান চিন্তা।

মাধবপুর উপজেলার নোয়াপাড়া, বৈকুণ্ঠপুর, জগদীশপুর, তেলিয়াপাড়া ও সুরমা চা বাগানের শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জাতীয় বাজেট কী, এতে তাদের জন্য কী ধরনের বরাদ্দ থাকে কিংবা এর প্রভাব তাদের জীবনে কীভাবে পড়ে, সে বিষয়ে অধিকাংশ শ্রমিকের সুস্পষ্ট ধারণা নেই।

নোয়াপাড়া চা বাগানের শ্রমিক রমেশ সাঁওতাল বলেন, “বাজেটের কথা টেলিভিশনে শুনি, কিন্তু এর ভেতরে কী থাকে তা জানি না। আমাদের চিন্তা সপ্তাহ শেষে মজুরি পাব কি না, সন্তানদের খাবার জুটবে কি না।”

একই বাগানের নারী শ্রমিক শ্যামলী মুন্ডা বলেন, “বাজারে সবকিছুর দাম বাড়ছে, কিন্তু আমাদের আয় সেই তুলনায় বাড়ে না। বাজেটে আমাদের জন্য কী আছে, কেউ কখনো জানায় না। তবে আমরা চাই সরকার ও জনপ্রতিনিধিরা আমাদের জীবনমান উন্নয়নে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নিক।”

স্থানীয়দের ভাষ্য, চা শ্রমিকদের একটি বড় অংশ এখনও দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছেন। বাসস্থান, বিশুদ্ধ পানীয় জল, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষাসুবিধার সংকট দীর্ঘদিনের। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন চা বাগানে বকেয়া মজুরি ও রেশন বিতরণ নিয়ে শ্রমিক অসন্তোষও দেখা গেছে। হবিগঞ্জের কয়েকটি বাগানে বকেয়া মজুরির দাবিতে আন্দোলন ও কর্মবিরতির ঘটনাও ঘটেছে।

শ্রমিক নেতাদের দাবি, জাতীয় বাজেটে চা শ্রমিকদের জন্য বিশেষ কল্যাণ তহবিল গঠন, স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ, আবাসন উন্নয়ন, নিরাপদ পানীয় জলের ব্যবস্থা এবং শিশুদের শিক্ষার জন্য পৃথক বরাদ্দ রাখা প্রয়োজন। পাশাপাশি বাজেট প্রণয়নের সময় শ্রমিকদের মতামত ও বাস্তব সমস্যাগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার আহ্বান জানান তারা।

অর্থনীতি ও শ্রম বিষয়ক বিশ্লেষকদের মতে, দেশের চা শিল্প জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও এই খাতের শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মান এখনও প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। কম মজুরি, সীমিত সামাজিক নিরাপত্তা এবং মৌলিক সেবার ঘাটতির কারণে তারা জাতীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুফল থেকে অনেকাংশেই বঞ্চিত।

স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, বাজেট ঘোষণার পর শুধু শহরকেন্দ্রিক আলোচনা নয়, গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মাঝেও এর প্রভাব ও গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। বিশেষ করে চা শ্রমিকদের মতো পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর চাহিদা ও প্রত্যাশা বাজেটে যথাযথভাবে প্রতিফলিত হওয়া জরুরি।

চা শ্রমিকদের সহজ ভাষায়, “বাজেটের হিসাব বুঝি না, কিন্তু এমন বাজেট চাই, যাতে আমাদের জীবনটা একটু ভালো হয়।


শেয়ার করুন