বানিয়াচংয়ে অবহেলিত বেদে সম্প্রদায় সরকারি নাগরিক সেবা থেকে বঞ্চিত

যুগ যুগ ধরে সকল প্রকার সরকারি এবং নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত বানিয়াচং উপজেলার প্রান্তিক জনগোষ্ঠী বেদে সম্প্রদায়ের লোকজন। পূর্ব পুরুষের পেশা এবং যাযাবর জীবন ত্যাগ করে অনেকেই এখন বানিয়াচং উপজেলার স্থায়ী বাসিন্দা। অনেকে পেয়েছেন ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ। তবে পাল্টায়নি তাদের দুঃখ দূর্দশার চিত্র। সরকারি সহায়তা, সামাজিক ও এলাকাভিত্তিক সকল প্রকার সুযোগ সুবিধা থেকে যুগযুগ ধরে বঞ্চিত প্রান্তিক এই জনগোষ্ঠী। 

জানা গেছে, দ্বাদশ শতাব্দীতে নৌপথে একঝাঁক নৌ-বহর নিয়ে বানিজ্যের জন্য বানিয়াচং এসেছিলেন বেদে সম্প্রদায়ের লোকজন। নদী ও বিলের ঘাটে ছুঁইয়া নৌকা নোঙর করে ব্যবসা করতেন তারা। নারী বাইদ্যানিরা ডাঙায় পায়ে হেটে ফেরী করতেন। ঝাঁড়ফোক, সাপের খেলা,গাছ গাছালির ঔষধ বিক্রি, আবার অনেকে নারীদের হাতের চুড়ি ও বাহারি পাথর রত্ন খচিত বিভিন্ন অলংকার বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। সঙ্গে বাড়ি সঙ্গে ঘর, এরই নাম যাযাবর এই প্রচলিত কথাটি তখনকার সময়ে বেদে জনগোষ্ঠীর প্রতিপ্রাদ্য ছিলো বলেও জানা গেছে।

স্থানীয় প্রবীণ মুরুব্বিরা বলেন, একসময় বানিয়াচং উপজেলার বিভিন্ন নদী ও বিলে ভাসমান নৌকায় যাযাবর বেদে সম্প্রদায়ের লোকজন বসবাস করতো। কালের বিবর্তনে ধীরে ধীরে বানিয়াচংয়ের অধিকাংশ জলপথ, নদী,খাল ও বিলগুলো ভরাট হওয়ার পর নৌকা ছেঁড়ে ডাঙায় বসবাস শুরু করে তারা। বর্তমানে অনেকে এখন বানিয়াচংয়ে বসত বাড়ি নির্মাণ করে স্থায়ী নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছেন। 

অনেক পুরুষ বেদেরা পূর্বের পেশা বদল করে ছাতা, টর্চ লাইট,গ্যাসের চুলা মেরামত করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। তবে কিছু বিধবা ও স্বামী পরিত্যক্ত বাইদ্যানিরা এখনও বানিয়াচংয়ের বিভিন্ন অঞ্চলে ফেরী করে ইমিটেশন এবং কাঁচের চুড়ি, অলংকার বিক্রি করে সংসার চালান।

বেদে হেকমত আলী বলেন, আমাদের পূর্ব পুরুষের আমল থেকেই আমরা বানিয়াচং বসবাস করছি। প্রথমে নদীর উপর ভাসমান নৌকায়। পরে নদীর পাড়ে তাবু করে। বর্তমানে আমরা কয়েকটি পরিবার ১নম্বর ইউনিয়নের চতুরঙ্গ রায়ের পাড়া(বন্দের বাড়ি) নামক এলাকায় বাড়িঘর নির্মাণ করে এখানকার স্থায়ী বাসিন্দা হয়েছি। ভোটের সময় ভোটও দেই।

অনেকের বাড়িঘর নেই,তারা পরিবার নিয়ে ভাড়া বাসায় থাকেন। পূর্বের পেশা বদল করে তিনিসহ অনেকে এখন ছাতা,টর্চ লাইট,গ্যাসের চুলা মেরামত করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। অভিযোগ করে তিনি আরো বলেন, যুগ যুগ ধরে আমরা অবহেলিত। বিগত সরকারের আমলে বানিয়াচংয়ে বিভিন্ন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে ঘরবাড়ি দিয়ে পুনর্বাসন ও সাহায্য করা হয়। কিন্তু বেদে সম্প্রদায়ের জন্য কোনপ্রকার সরকারি সাহায্য বা পুনর্বাসন করা হয়নি। এমনকি এলাকায় সামাজিকভাবেও তাদের বাইদ্যা বলে অবজ্ঞা করা হয়। বেদে সম্প্রদায়ের পুনর্বাসন এবং সরকারি সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করতে বর্তমান সরকারের প্রতিনিধিদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি।

বানিয়াচংয়ের বিশিষ্ট সমাজকর্মী সৈয়দ মিজান উদ্দিন পলাশ বলেন, কাউকে বাদ দিয়ে নয়, প্রজন্মকে ভালো কিছু উপহার দিতে হলে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। তবেই একটি সুন্দর সমাজ বিনির্মাণ হবে। মূলধারার মানুষের সাথে বিভিন্ন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর যোগাযোগ ও সম্পৃক্ততা বাঁড়াতে হবে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠী বেদে সম্প্রদায়ের মানুষকে পুনর্বাসন, নাগরিক সুবিধা ও ভালো কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি।

উল্লেখ্য-বিভিন্ন গ্রন্থের তথ্য এবং গবেষকদের মতে বেদেরা মোগল আমলের ১৬৩৮ সালে আরাকান থেকে বাংলাদেশের ঢাকায় এসেছিল। মনতং সম্প্রদায়ের লোক বলে তারাও চিহ্নিত হয়। পরে সেখান থেকে বিক্রমপুর,পশ্চিম বঙ্গ ও আসামে তারা ছড়িয়ে পড়ে। হাতুড়ে চিকিৎসার সাথে সম্পৃক্ত বলে মনতংরা কালক্রমে বেদে নামে পরিচিতি পায়। বাংলাদেশের বেশিরভাগ বেদেরা মুসলিম ধর্ম গ্রহণ করে এবং দীক্ষা লাভ করে। বেদেরা ৯ ভাগে বিভক্ত যেমন, সাপুড়িয়া,বাজিকর,মিচ্ছিগিরি,বাবাজিয়া, চাপাইল্লা,গাইন, বান্দাইরা ও ম্লেছ। 

এব্যাপারে বানিয়াচং উপজেলা নির্বাহী অফিসার মাহমুদা বেগম সাথী বলেন, সরকার মানুষের জীবন-মান উন্নত করতে ইতিমধ্যে ফ্যামিলী কার্ড, কৃষি কার্ডসহ বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে। বানিয়াচংয়ের বেদে সম্প্রদায়সহ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বিষয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাথে আলাপ করবো।  


শেয়ার করুন