বিবিসি বাংলার বিরুদ্ধে আলোচিত মাহদীর লিগ্যাল নোটিশ-আল্টিমেটাম

ভুয়া সংবাদ প্রতিবেদন সরাতে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে আইনি নোটিশ দিয়েছেন হবিগঞ্জের আলোচিত বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন নেতা মাহদী হাসান। গত রবিবার (৮ মার্চ) দেওয়া লিগ্যাল নোটিশে প্রতিবেদন সরাতে ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দেওয়া হয়েছে। অন্যথায় সংবাদমাধ্যমটির বিরুদ্ধে ১ কোটি টাকার মানহানি মামলা করা হবে বলেও হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। মাহদীর পক্ষে বিবিসি বাংলাকে এই লিগ্যাল নোটিশটি পাঠিয়েছেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার এসএম  শাহরিয়ার কবির। বিবিসির মহাপরিচালক টিম ডেভি ও বিবিসি বাংলার প্রধান সম্পাদক মীর সাব্বির বরাবর এই নোটিশ পাঠানো হয়েছে।

নোটিশে ঘটনার প্রেক্ষাপট হিসেবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস তুলে ধরে বলা হয়েছে, মাহদী হাসান ২০২৪ সালের গৌরবময় জুলাই বিপ্লবের একজন সম্মুখসারির যোদ্ধা এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের জেলা প্রতিনিধি। তার অবিচল প্রচেষ্টা ও সাহসের কারণে বাংলাদেশ স্বৈরাচারী আওয়ামী শাসন থেকে মুক্ত হয়। সে সময় আওয়ামী লীগ সরকার ও তার নিরাপত্তা-গোয়েন্দা সংস্থাসহ আওয়ামী লীগের সাথে সংশ্লিষ্ট সহিংস সংগঠনগুলো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে। এতে হাজার হাজার প্রতিবাদী আহত হয়েছে, অগণিত গ্রেপ্তার হয়েছে এবং নির্যাতনসহ অন্যান্য অমানবিক আচরণের ঘটনা ঘটেছে।

এতে বলা হয়, ২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৪ দলীয় জোট মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে এবং ১ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট ২০২৪ পর্যন্ত ১৪০০ জনকে হত্যা ও কয়েক হাজার মানুষকে আহত করেছে। এ সময় জনগণের রোষ ও ক্ষোভের কারণে পুলিশ ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে অনেক প্রতিরোধ সংঘটিত হয়েছে।

লিগ্যাল নোটিশে মাহদীর আইনজীবী লিখেছেন, একটি ঘটনার সময় একজন পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে বাগবিতণ্ডার কারণে আমার ক্লায়েন্টকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল, পরে বিজ্ঞ ম্যাজিস্ট্রেট আদালত তার জামিন মঞ্জুর করেন। পরবর্তীতে আমার মেধাবী ক্লায়েন্ট উচ্চতর শিক্ষার জন্য ফিনল্যান্ডের ভিসা পাওয়ার চেষ্টা করছেন। কিন্তু বিভিন্ন ভ্রান্ত ও অসম্পূর্ণ খবর এবং যাচাইহীন পোস্টের ভিত্তিতে গত ২১ ফেব্রুয়ারি বিবিসি বাংলা আমার ক্লায়েন্ট সম্পর্কে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, যা সম্পূর্ণ বিভ্রান্তিকর এবং মানহানিকর।

বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন সম্পর্কে লিগ্যাল নোটিশে বলা হয়, প্রতিবেদনটির শিরোনাম ছিল ‘মাহদী হাসানের সঙ্গে দিল্লিতে ঠিক কী হয়েছিল?’, যা ভারতের অপ্রকাশিত দুটি গোপন গোয়েন্দা রিপোর্টের ভিত্তিতে লেখা। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আমার ক্লায়েন্ট পর্তুগালের ভিসা নেওয়ার জন্য গিয়েছিলেন, যা সম্পূর্ণ মিথ্যা। এছাড়া এতে বলা হয়েছে যে তিনি এয়ারপোর্টের কাছে হোটেলে রাত কাটিয়েছেন এবং তার কাছে ক্রিপ্টোকারেন্সি বা ডিজিটাল মুদ্রা রয়েছে, যা ভিত্তিহীন তথ্য। এছাড়া তিনি এসআই সন্তোষ চৌধুরীকে হত্যা করেছেন বলেও উল্লেখ করা হয়, যা সম্পূর্ণ মিথ্যা ও আওয়ামী প্রোপাগান্ডা। এর ফলে আমার ক্লায়েন্ট সাইবার-আক্রমণ, সামাজিক অপমান এবং আওয়ামী দুষ্কৃতিকারীদের হামলার শিকার হয়েছেন। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ফ্যাক্টচেকভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ডিসেন্ট’ একটি বিস্তারিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, যা ওই মানহানিকর তথ্যগুলোকে চ্যালেঞ্জ করে এবং আমার ক্লায়েন্টের পক্ষে প্রমাণ তুলে ধরে।

গত ১৭ বছর বাংলাদেশি গণমাধ্যম প্রায়শ আওয়ামী সরকারের পুতুল হয়ে কাজ করেছে উল্লেখ করে এতে বলা হয়, এর ফলে সাংবাদিকতা পেশার প্রতি জনগণের আস্থা কমেছে। আপনাদের এই ভ্রান্ত ও বিভ্রান্তিকর সংবাদ আমার ক্লায়েন্টের প্রতি প্রচুর নেতিবাচক প্রভাব, মানসিক কষ্ট এবং সামাজিক হেনস্থা সৃষ্টি করেছে। বিবিসি বিশ্বজুড়ে স্বচ্ছতা ও ইতিবাচক সাংবাদিকতার জন্য পরিচিত। তবে আওয়ামী লীগের প্ররোচনায় বিবিসি বাংলা এই বিভ্রান্তিকর সংবাদ প্রকাশ করেছে, যার নেপথ্যে শুধুমাত্র আমার ক্লায়েন্টকে হয়রানি করার উদ্দেশ্যেই নয়, বরং জুলাই বিপ্লবের মনোবলকে ক্ষুণ্ণ করার উদ্দেশ্যও রয়েছে।

এ প্রতিবেদনের ফলে মাহদী হাসানের মানহানি হয়েছে উল্লেখ করে বলা হয়, আপনাদের ভ্রান্ত প্রকাশনার কারণে আমার ক্লায়েন্ট গুরুতর মানসিক কষ্ট, সামাজিক অপমান এবং দুষ্কৃতিকারীদের আক্রমণের শিকার হয়েছেন। এটি বাংলাদেশ দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর ধারা ৪৯৯ অনুযায়ী মানহানিকর এবং ধারা ৫০০ অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এই মানহানিকর প্রতিবেদনের কারণে আমার ক্লায়েন্ট আর্থিক ক্ষতি, সামাজিক মর্যাদা হ্রাস এবং আনুমানিক ১ কোটি টাকা সমমূল্যের ক্ষতির শিকার হয়েছে, যার ক্ষতিপূরণ আপনার দায?িত্ব। এই পরিস্থিতিতে আমরা আপনার কাছে অনুরোধ করছি— ২১ ফেব্রয়ারি প্রকাশিত প্রতিবেদনটি অপসারণ করে বিবিসি বাংলার সকল প্ল্যাটফর্মে ক্ষমা প্রার্থনা করুন এবং স্বীকার করুন যে প্রতিবেদনের উৎস অস্পষ্ট ও অনিশ্চিত ছিল।

পত্রপ্রাপ্তির ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে এ পদক্ষেপ না নেওয়া হলে বাংলাদেশ দণ্ডবিধি ১৮৬০ অনুযায়ী মানহানির মামলা, আর্থিক ক্ষতিপূরণ মামলা এবং সাইবার নিরাপত্তা অধ্যাদেশ ২০২৫ অনুযায়ী মামলা দায়ের করা হবে বলে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। লিগ্যাল নোটিশে বলা হয়েছে, আমাদের লক্ষ্য শুধু আইনি পদক্ষেপ নয়, বরং সত্য প্রকাশ এবং ক্লায়েন্টের ক্ষতির প্রতিকার।



শেয়ার করুন