বাংলাদেশে বজ্রপাতে প্রতি বছর গড়ে ৩০০ জনের মতো মানুষ মারা যাচ্ছে। চলতি বছরের চার মাস অতিবাহিত না হতেই মৃত্যু হয়েছে অর্ধশতাধিক মানুষের। কিন্তু, বজ্রপাতে মৃত্যুর মিছিল রোধে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ নেই বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
বজ্রপাতে মৃত্যু প্রতিরোধে বিভিন্ন সময়ে প্রকল্প প্রণয়ন করা হলেও তা শেষ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেনি। যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, সেগুলোও খুব একটা কাজে আসেনি। যদিও বজ্রপাতে মৃত্যুহার বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে ২০১৬ সালের মে মাসে বজ্রপাতকে দুর্যোগ ঘোষণা করে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়।
আবহাওয়া ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, আবহাওয়ার ধরন বদলে যাওয়া, পরিবেশ দূষণ, নির্বিচারে গাছ কাটাসহ নানান কারণে বজ্রপাত বেড়ে গেছে, এতে মৃত্যুও বাড়ছে। প্রতি বছর শতশত কৃষক, প্রান্তিক মানুষ মারা যাচ্ছেন।
সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বজ্রপাতে মৃত্যুরোধে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হতে পারে সচেতনতা। সংশ্লিষ্টদের সচেতন করার সৃষ্টির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে একটি প্রকল্প নেওয়ার কাজও চলছে।
গত জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলনে নেত্রকোনার ডিসি বজ্রপাতপ্রবণ এলাকায় বজ্রপাত থেকে মানুষকে রক্ষার জন্য মাল্টিপারপাস শেড নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। পরে সেই প্রস্তাবের বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে তা মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। মন্ত্রণালয় থেকে তা পাঠানো হয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরে। এরপর অধিদপ্তর এটা নিয়ে কাজ করছে।
সাধারণত মার্চের শেষ ও এপ্রিলের শুরুর দিকে বজ্রপাতের মৌসুম শুরু হয়। জুন ও জুলাই পর্যন্ত তা থাকে। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দেখা গেছে, এখন বজ্রপাতের কোনো হিসাব মিলছে না। বর্ষাকালেও এখন বজ্রপাত হচ্ছে, মানুষ মারা যাচ্ছে।- মো. আব্দুল্লাহ আল-মামুন, পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন), দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বজ্রপাতপ্রবণ এলাকাগুলোতে নতুন করে একটি প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। এ প্রকল্পের আওতায় বজ্রপাতপ্রবণ বিশেষ করে হাওরাঞ্চলে ‘মাল্টিপারপাস শেড’ নির্মাণ করা হবে। আকাশে বজ্রমেঘ দেখলেই কৃষকরা সেখানে আশ্রয় নিতে পারবেন। প্রকল্প প্রণয়নের জন্য উপজেলা পর্যায় থেকে প্রস্তাব চাওয়া হয়েছে। প্রস্তাব পেলে প্রকল্প চূড়ান্ত করা হবে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ রোববার (২৬ এপ্রিল) দেশের বিভিন্ন জেলায় বজ্রপাতে অন্তত ১৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। এদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এসব প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।এর মধ্যে গাইবান্ধায় পাঁচজন, সিরাজগঞ্জে দুজন, জামালপুরে দুজন, ঠাকুরগাঁওয়ে দুজন, বগুড়ায় একজন, নাটোরে একজন ও পঞ্চগড়ে একজন মারা গেছেন। এসব ঘটনায় অনেকে আহত হয়েছেন।
এর আগে গত ১৮ এপ্রিল (৫ বৈশাখ) একদিনে বজ্রপাতে সর্বাধিক ১৩ জনের মৃত্যু হয়। বৈশাখের আগেও বজ্রপাতে প্রাণহানি ঘটেছিল কমপক্ষে ৩০ জনের। ৪৩ জনের মধ্যে পুরুষ ৩৮ জন; নারী দুজন আর তিনজন শিশুও মারা গেছে। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ২৪ জনই কৃষক।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) মো. আব্দুল্লাহ আল-মামুন জাগো নিউজকে বলেন, ‘সাধারণত মার্চের শেষ ও এপ্রিলের শুরুর দিকে বজ্রপাতের মৌসুম শুরু হয়। জুন ও জুলাই পর্যন্ত তা থাকে। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দেখা গেছে, এখন বজ্রপাতের কোনো হিসাব মিলছে না। বর্ষাকালেও এখন বজ্রপাত হচ্ছে, মানুষ মারা যাচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘আমরা বজ্রপাতের বিষয়ে মানুষের সচেতন করার কাজটি করছি। জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে আমাদের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি আছে। আমাদের এক পৃষ্ঠার একটি সতর্কবার্তা আছে, সেটা আমরা সবার কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছি যেন মানুষ সচেতন হন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও এ সতর্কবার্তা পৌঁছে দিতে কাজ করছি।’
অতিরিক্ত সচিব আরও বলেন, ‘২০২১-২২ অর্থবছরে ১৫টি বজ্রপাতপ্রবণ এলাকায় টিআর কর্মসূচির আওতায় ১৫ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল, এ টাকা দিয়ে ওই এলাকায় ৩৪৩টি বজ্র নিরোধক দণ্ড স্থাপন করা হয়েছে।’
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর একটি প্রকল্প প্রণয়নে কাজ করছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রকল্পের আওতায় বজ্রপাতে মৃত্যুরোধে বজ্রপাতপ্রবণ এলাকায় মাল্টিপারপাস শেড নির্মাণ করা হবে। এ শেডে বজ্র নিরোধক ব্যবস্থা থাকবে। এ শেড কৃষকরা ধান মাড়াই, স্বল্প সময়ের জন্য ধান মজুতসহ বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করতে পারবেন। বন্যার সময় আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবেও এগুলো ব্যবহার করা হবে।’
মো. আব্দুল্লাহ আল-মামুন আরও বলেন, ‘সিলেট, সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, হবিগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, মৌলভীবাজার জেলার সব উপজেলা থেকে প্রস্তাব চাওয়া হয়েছে। প্রস্তাব পেলে আমরা প্রকল্প নেবো। প্রাথমিকভাবে চিন্তাভাবনা হচ্ছে। তবে জেলার সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। কারণ আমরা এটা নিয়ে কাজ করছি। সব প্রস্তাব পাওয়ার পর একটার সম্ভাব্যতা যাচাই হবে।’
‘মাঠ ও হাওরের কৃষকরা যেখানে কাজ করেন, আশপাশে কোথাও আশ্রয় নেওয়ার জায়গা নেই, সেখানে এ মাল্টিপারপাস শেডগুলো নির্মাণের চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। প্রাথমিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এক বিঘা জমির ?ওপর এটা হবে।’
