হবিগঞ্জ সদর হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে চরম অব্যবস্থাপনা

ঘড়ির কাঁটা তখন বেলা ১১টা পেরিয়েছে। হবিগঞ্জ সদর হাসপাতাল-এর শিশু ওয়ার্ডের মেডিসিন শাখায় প্রতিটি বেড ভর্তি রোগী ও স্বজনদের ভিড়ে। জায়গা না পেয়ে স্যাঁতসেঁতে ও নোংরা মেঝেতেই চিকিৎসা নিতে দেখা যায় বিভিন্ন বয়সী কয়েকজন শিশুকে।

মেঝেতে চিকিৎসাধীন শিশুদের একজন দুই বছর বয়সী আবদুল মোমিন। কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসায় সকালে তাকে লাখাই উপজেলা থেকে হাসপাতালে নিয়ে আসেন মা মঞ্জুরা বেগম। শিশুটিকে রাখা হয়েছিল এমন এক বিছানায়, যার আসল রং প্রায় মুছে গিয়ে কালচে হয়ে গেছে। তার ওপর একটি পলিথিন বিছিয়ে কোলে করে সন্তানকে ধরে ছিলেন মা। শিশুটির পায়ে ক্যানুলা লাগানো, চলছে স্যালাইন। এমন অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে সন্তান আরও অসুস্থ হয়ে পড়বে কি না জানতে চাইলে অসহায় কণ্ঠে মঞ্জুরা বলেন, “কিতা করতাম, আর কোনো উপায় আছেনি?”

ওয়ার্ডে থাকা একাধিক রোগীর স্বজনদের অভিযোগ, হাসপাতালের অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে দীর্ঘ সময় অবস্থানের কারণে রোগীর অবস্থার আরও অবনতি হচ্ছে। পাশাপাশি তারাও নানা শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন।

চুনারুঘাট উপজেলার বড়আব্দা এলাকার গৃহবধূ শিবলি আক্তার জানান, আট মাস বয়সী ছেলেকে নিয়ে পাঁচ দিন আগে হাসপাতালে ভর্তি হন তিনি। প্রথমে শিশুটির ঠান্ডা ও জ্বর ছিল। কিন্তু হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার দুই দিন পর থেকে শিশুটি ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়। বর্তমানে হাসপাতাল থেকে স্যালাইনও দেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেন তিনি। ফলে বাইরে থেকে কিনে চিকিৎসা চালাতে হচ্ছে।

বেলা ১১টা ১০ মিনিট পেরিয়ে গেলেও ওয়ার্ডে কোনো পরিচ্ছন্নতাকর্মীর দেখা মেলেনি। এ সময় চা-বিস্কুট নিয়ে এক হকারকে শিশুদের বেডের পাশে গিয়ে স্বজনদের কাছে পণ্য বিক্রি করতে দেখা যায়। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করেন অনেক স্বজন।

বানিয়াচং উপজেলার সাগরদীঘি এলাকার বাসিন্দা রাবেয়া বেগম বলেন, “আমাগোর সবচেয়ে বড় সমস্যা বাথরুম। তিন দিন ধইরা আছি, কিন্তু ব্যবহার করার মতো বাথরুম নাই। চার-পাঁচটা বাথরুমের মধ্যে একটা ছাড়া সব অচল। খাওয়ার পানিরও ব্যবস্থা নাই, বেসিনও নাই।”

রাবেয়ার দেখানো টয়লেটগুলো ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশই ব্যবহারের অনুপযোগী। কোনো টয়লেটের দরজা নেই, কোনোটি আবার ময়লা ও দুর্গন্ধে ভরা। একটি টয়লেটের পাইপ ব্লক হয়ে উপচে পড়ছিল নোংরা পানি। পুরো ফ্লোরের রোগী ও স্বজনদের একটি মাত্র ব্যবহারযোগ্য টয়লেটের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, পরিচ্ছন্নতাকর্মীর অভাবে রোগীর স্বজনরাই ঝাড়ু দিচ্ছেন। হামিদা খাতুন নামের এক নারী নিজ উদ্যোগে কক্ষ পরিষ্কার করে ময়লা এক পাশে জমা রাখেন। পাশের কক্ষেও আরেক নারীকে মেঝে মুছতে দেখা যায়। বিশাল কমনরুমে ৮ থেকে ১০ শিশু ছড়িয়ে-ছিটিয়ে চিকিৎসা নিচ্ছে।

প্রায় ১১টা ৩৭ মিনিটে দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিচ্ছন্নতাকর্মীর দেখা মিললেও তিনি কিছুক্ষণ কাজ করে চলে যান। পরে আবার ফিরে এসে দুপুর ১২টা ৩২ মিনিটে কমনরুমের ঝাড়ু দেওয়া শেষ করেন।

হাসপাতালের এক দায়িত্বরত চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ শুধু রোগীদের জন্য নয়, চিকিৎসকদের জন্যও জরুরি। কিন্তু হাসপাতালের অবস্থা শিশুদের জন্য অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর।

অন্যদিকে, রোগীর স্বজনদের অসচেতনতাকেও দায়ী করছেন কেউ কেউ। এক অভিভাবক বলেন, “আমরাই তো ভালা না। ময়লা ডাস্টবিনে না ফেলে যেখানে সেখানে ফেলি।”

ইয়াসমিন বেগম নামের এক নারী জানান, নোংরা টয়লেট ব্যবহার করে এসে তিনি নিজেই অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তিনি বলেন, “ওই বাথরুমে যাওনের পর সারাদিন বমি করছি। এখন পুরান বিল্ডিংয়ের দুই তলার বাথরুম ব্যবহার করি।”

তিনি আরও অভিযোগ করেন, রোগীদের জন্য বরাদ্দ অনেক বেডই ভাঙাচোরা। “এই বেডে বসে আমি আর ছেলের বউ দুজনই পড়ে গেছি। সুস্থ হতে এসে উল্টো অসুস্থ হইতেছি,” বলেন তিনি।

দুপুর ১টা পর্যন্ত ওয়ার্ডে অন্তত চারজন হকারকে বারবার ঢুকতে দেখা যায়। মানিক নামের এক হকার বলেন, হাসপাতালে ঢুকতে তাঁদের কেউ বাধা দেন না। রোগীর স্বজনরাও তাদের কাছ থেকে নিয়মিত পণ্য কিনে থাকেন।

এ বিষয়ে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক আমিনুল হক সরকার বলেন, পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা সাধারণত দিনে দুইবার মেঝে পরিষ্কার করেন। দায়িত্বে অবহেলার বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।

টয়লেট সংকটের বিষয়ে তিনি জানান, অনেক স্বজন শিশুদের ডায়াপার টয়লেটে ফেলায় পাইপ ব্লক হয়ে যায়। সমস্যাগুলো সমাধানে গণপূর্ত বিভাগকে জানানো হয়েছে এবং দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস পাওয়া গেছে। পাশাপাশি হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে রোগীর স্বজনদেরও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।


শেয়ার করুন