পুষ্টিহীনতায় ভুগছে মাধবপুর-চুনারুঘাটের ২৩ বাগানের হাজারো শিশু ॥ বাড়ছে উদ্বেগ

সবুজে ঘেরা চা বাগানের নয়নাভিরাম সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক নীরব মানবিক সংকট। মাধবপুর ও চুনারুঘাট উপজেলার ২৩টি চা বাগানে বেড়ে ওঠা হাজারো শিশু এখনও পুষ্টিহীনতা, দারিদ্র্য ও সীমিত স্বাস্থ্যসেবার কারণে ঝুঁকিপূর্ণ জীবনযাপন করছে। সচেতন মহলের মতে, চা শ্রমিক পরিবারের শিশুদের স্বাভাবিক শারীরিক ও মানসিক বিকাশ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। সরেজমিনে উপজেলার নালুয়া, বৈকুণ্ঠপুর, হাতিমারা ও জগদীশপুরসহ কয়েকটি চা বাগান ঘুরে দেখা যায়, অনেক শিশুর শরীরে অপুষ্টির স্পষ্ট লক্ষণ রয়েছে। বয়স অনুযায়ী ওজন ও উচ্চতা কম, শারীরিক দুর্বলতা, ঘনঘন অসুস্থতা এবং রক্তস্বল্পতায় ভুগছে তারা। দীর্ঘদিনের দারিদ্র্য, পুষ্টিকর খাদ্যের অভাব ও সচেতনতার ঘাটতিকে এ অবস্থার জন্য দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। নালুয়া চা বাগানের শ্রমিক সমীর তন্তুবায় জানান, দৈনিক মজুরিতে সংসারের নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ মেটানোই কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে সন্তানদের জন্য নিয়মিত দুধ, ডিম, মাছ কিংবা ফলমূলের ব্যবস্থা করা সম্ভব হয় না। এতে শিশুরা প্রয়োজনীয় পুষ্টি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। হাতিমারা চা বাগানের শ্রমিক অমরি চাষা বলেন, বাগান এলাকায় শিশুদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও চিকিৎসা সেবা সীমিত। অর্থাভাবে অনেক পরিবার সময়মতো চিকিৎসা নিতে পারে না। এতে শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও মৌলভীবাজার সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চা বাগান এলাকার স্বাস্থ্য পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, এসব এলাকার শিশুদের মধ্যে খর্বকায় হওয়ার হার ৪৫ শতাংশ, শীর্ণকায় ২৭ শতাংশ এবং স্বল্প ওজনের শিশু ৪৭ দশমিক ৫ শতাংশ। এছাড়া ৬৭ শতাংশ পরিবার ন্যূনতম স্যানিটেশন সুবিধা থেকে বঞ্চিত। বাল্যবিয়ের হার ৪৬ শতাংশ হওয়ায় মাতৃস্বাস্থ্যের ঝুঁকিও বাড়ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শৈশব থেকেই অপুষ্টিতে ভোগার কারণে চা বাগানের মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। ফলে তারা বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে। ২০২১ থেকে ২০২৪ সালের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, জেলায় শনাক্ত হওয়া ১৯ হাজার ৯১৪ জন যক্ষ্মা রোগীর মধ্যে ৭ হাজার ২২০ জনই চা বাগান এলাকার বাসিন্দা। কুষ্ঠ রোগের চিত্র আরও উদ্বেগজনক। একই সময়ে জেলায় শনাক্ত ৭৬১ জন কুষ্ঠ রোগীর মধ্যে ৬৩১ জনই চা বাগানের বাসিন্দা, যা মোট আক্রান্তের প্রায় ৮৩ শতাংশ। চা শ্রমিক নেত্রী খাইরুন আক্তার বলেন, পরিস্থিতির উন্নয়নে শুধু প্রকল্প গ্রহণ করলেই হবে না, সেগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। মাতৃস্বাস্থ্য, শিশুপুষ্টি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে সরকার, বাগান কর্তৃপক্ষ ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

মাধবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. ইমরুল হাসান জাহাঙ্গীর বলেন, অপুষ্টি শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। চা বাগান এলাকায় গর্ভবতী মা ও শিশুদের পুষ্টি বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং সুষম খাদ্য নিশ্চিত করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য বিভাগের পাশাপাশি পরিবার, স্থানীয় প্রশাসন ও বাগান কর্তৃপক্ষেরও সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন।

হবিগঞ্জের জেলা প্রশাসক জি এম সরফরাজ বলেন, চা বাগান এলাকার মানুষের জীবনমান উন্নয়নে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে। শিশুদের পুষ্টি, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণে আরও কার্যক্রম গ্রহণ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, চা বাগানের প্রতিটি শিশুই দেশের সম্পদ। তাদের সুস্থ ও দক্ষ নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে সবাইকে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে। সংশ্লিষ্টদের মতে, সঠিক পুষ্টি, উন্নত স্যানিটেশন ব্যবস্থা এবং মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা গেলে চা বাগানের নতুন প্রজন্ম দেশের উন্নয়ন ও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হবে।



শেয়ার করুন