এক সময় জ্যৈষ্ঠ মাস আসলেই আজমিরীগঞ্জ ও মিঠামইনসহ পুরো হাওরাঞ্চলে কুড়া পাখির 'টপ টপ' ডাক শোনা যেতো। আজমিরীগঞ্জের জোড়বিল, চিলারাগ বিল কিংবা মিঠামইনের কাঞ্চনপুরের বাফনার বিল ও সোনারতালে এখন আর কুড়া পাখির ডাক তেমন একটা শোনা যায় না বললেই চলে। গ্রীষ্মের শুরুতে দোয়েল পাখির মিষ্টি শিস কিংবা দুই-তিন দশক আগের বালিহাঁস ও বুনোহাঁসের দল বেঁধে আড্ডা এখন আর চোখে পড়ে না। মূলত একশ্রেণির শিকারির উৎপাত এবং জঙ্গল ও বিল-ঝিল কমে যাওয়ার কারণেই জলজ পাখিদের বিচরণ ও আবাস্থল সংকুচিত হয়ে পড়েছে।
পূর্বে হাওরের গ্রামগুলোতে বক ও পানকৌড়ির বিচরণ সকাল-সন্ধ্যায় গ্রামীণ পরিবেশকে মুখরিত করে রাখতো, যা পথিককেও কিছুক্ষণের জন্য থামিয়ে দিতো। অথচ এখন বড় বড় গাছ কেটে ফেলা এবং শিকারিদের দৌরাত্ম্যে এই পাখিদের দেখাই মেলে না। সরেজমিনে দেখা যায়, এক সময় আজমিরীগঞ্জের আনন্দপুর, কাকাইলছেও, জলসুখা, সমিপুর; ইটনা উপজেলার কাকডেংগুর, জয়সিদ্ধি, ওয়াড়া এবং মিঠামইনের কেওয়াড়জোড়, গোপদিঘী ও ঢাকি গ্রামে প্রচুর পাখির আনাগোনা থাকলেও এখন তা প্রায় শূন্যের কোঠায়।
পাখির পাশাপাশি হারিয়ে গেছে হাওরের রূপ বাড়িয়ে দেওয়া শাপলা-শালুক, হিজল, হুগলা ও কেওড়ালীর মতো অজস্র জলজ উদ্ভিদ। বর্ষাকালে হাওরের স্বচ্ছ জলে এসব জলজ উদ্ভিদ এক অপূর্ব জৌলুসের সৃষ্টি করতো। এখন সুনামগঞ্জ জেলা এবং মিঠামইন ও অষ্টগ্রাম উপজেলার কিছু অংশ ছাড়া এগুলো আর তেমন দেখা যায় না। বর্ষায় আগের মতো পানি না হওয়া এবং জমিতে নানা ধরনের জাল টানানোর ফলে জলজ উদ্ভিদের জন্ম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
হাওরের আরও একটি অন্যতম সৌন্দর্য ছিল সাতসকালে গৃহিণীদের দই থেকে ঘি তোলার ‘মাঠা ফাঁক’ করার শব্দ। ঘি তোলার পর পাড়া-প্রতিবেশী বা আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে মাঠা পাঠানো কিংবা মানুষের ভিড় জমানোর সেই ঐতিহ্য এখন বিলুপ্তির পথে।
দুই-তিন দশক আগেও হাওরাঞ্চলের বসতিগুলো ছিল বেশ পাতলা। ফাঁকা জায়গায় বুনোফুল আর ঘাসের চাদর বিছানো থাকতো, যেখানে শোভা পেত সুন্দর সুন্দর কুঁড়েঘর। এখন জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে ফাঁকা জায়গা কমে গেছে, বাড়ছে দালানকোঠা। ঘন ঘন বাড়ি-ঘর হওয়ায় আগের মতো আলো-বাতাসও খেলে না, আর বাড়ির পাশে দেখা যায় না কলাগাছের সারি।
কাকাইলছেও গ্রামের সচেতন নাগরিক বনি আমিন আনসারী জানান, মানুষের মন থেকে প্রকৃতির প্রতি দরদ ও সৌন্দর্যের আকর্ষণ কমে যাওয়ার কারণেই পাখি, গাছপালা ও বাগান হারিয়ে যাচ্ছে।
এই বিষয়ে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) সিলেট বিভাগীয় সমন্বয়কারী অ্যাডভোকেট সাহেদা আক্তার জানান, নির্বিচারে মাটি ভরাট, নতুন নতুন বাড়ি-ঘর তৈরি এবং জলাশয় সংকুচিত হয়ে যাওয়ার কারণেই মূলত পরিবেশের এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আজ বিলীন হতে বসেছে।
