শায়েস্তাগঞ্জে কাঁচা রাস্তায় দুর্ভোগে তিন গ্রামের মানুষ ॥ নিজ উদ্যোগে সংস্কার

শায়েস্তাগঞ্জ পৌরসভার ৬নং ওয়ার্ডের পূর্ব লেঞ্জাপাড়া এলাকার প্রায় দেড় কিলোমিটার কাঁচা রাস্তা দীর্ঘদিন ধরে অবহেলায় পড়ে রয়েছে। সামান্য বৃষ্টিতেই রাস্তাটি কাঁদা ও পানিতে ডুবে ভয়াবহ বেহাল অবস্থার সৃষ্টি হয়। এতে পূর্ব লেঞ্জাপাড়া, আলাপুর, সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্প এলাকা ও কলিমনগর চরহামুয়া গ্রামের কয়েক হাজার মানুষ প্রতিদিন চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। দীর্ঘদিনেও রাস্তা সংস্কার বা পাকা করার কার্যকর উদ্যোগ না থাকায় এলাকাবাসীর মধ্যে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে। জানা যায়, শায়েস্তাগঞ্জ-হবিগঞ্জ বাইপাস সড়কের পূর্ব পাশে ফরেস্ট অফিস সংলগ্ন এলাকা থেকে শুরু হয়ে শায়েস্তাগঞ্জ ইউনিয়নের আলাপুর গ্রামের গোপাট পর্যন্ত বিস্তৃত এই গুরুত্বপূর্ণ সড়কটি কয়েক যুগ ধরে কাঁচা অবস্থায় রয়েছে। অথচ এটি আশপাশের কয়েকটি গ্রামের মানুষের প্রধান যাতায়াত পথ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। সরেজমিনে দেখা গেছে, সামান্য বৃষ্টিতেই পুরো রাস্তা কাঁদায় পরিণত হয় এবং বিভিন্ন স্থানে পানি জমে থাকে। বর্ষা মৌসুমে রাস্তার অনেক অংশ পানির নিচে তলিয়ে যায়। ফলে যান চলাচল তো দূরের কথা, সাধারণ মানুষের পায়ে হেঁটে চলাচলও অত্যন্ত কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। বিশেষ করে শিক্ষার্থীরা বই-খাতা নিয়ে কাঁদা পানির মধ্য দিয়ে চলাচল করতে বাধ্য হচ্ছে, যা তাদের জন্য বড় ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিদিন প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ এই সড়ক ব্যবহার করেন। আলাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়, শায়েস্তাগঞ্জ কামিল মাদ্রাসা, জহুর চান মহিলা কলেজ ও শায়েস্তাগঞ্জ ডিগ্রি কলেজের শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের অন্যতম ভরসা এই রাস্তা। কিন্তু বর্তমান অবস্থার কারণে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত স্কুল-কলেজে যাওয়া-আসা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। একজন পথচারী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “পৌরসভার অন্তর্ভুক্ত হলেও লেঞ্জাপাড়ায় উন্নয়নের কোনো ছোঁয়া নেই। সামান্য বৃষ্টিতেই রাস্তা দিয়ে হাঁটা অসম্ভব হয়ে পড়ে।” একজন কৃষক বলেন, “আমাদের এলাকা কৃষিনির্ভর। কিন্তু রাস্তার কারণে সময়মতো সার, বীজ ও কীটনাশক আনা যায় না। উৎপাদিত ফসল বাজারে নিতে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়।” শুধু দৈনন্দিন চলাচল নয়, এই রাস্তার বেহাল অবস্থার কারণে মানবিক বিপর্যয়ের ঘটনাও ঘটছে। এলাকাবাসী জানান, মাত্র দুই দিন আগে আলাপুর গ্রামের এক গুরুতর অসুস্থ রোগীকে সময়মতো হাসপাতালে নেওয়া সম্ভব হয়নি। পরে ঠেলাগাড়িতে করে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হলেও চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। মৃত্যুর পর হাসপাতাল থেকে মরদেহ বাড়িতে আনার সময়ও অ্যাম্বুলেন্স গ্রামের ভেতরে প্রবেশ করতে পারেনি। বাধ্য হয়ে স্বজনদের দেড় কিলোমিটার কাদাপানির রাস্তা পেরিয়ে খাটিয়ায় করে মরদেহ বাড়িতে নিয়ে যেতে হয়েছে। এছাড়াও প্রায় এক মাস আগে এক প্রসূতি মায়ের প্রসব ব্যথা উঠলে রাস্তার করুণ অবস্থার কারণে কোনো যানবাহন প্রবেশ করতে পারেনি। পরে স্বজনরা তাকে কাঁধে ও কোলে করে প্রধান সড়ক পর্যন্ত নিয়ে আসেন। এলাকাবাসীর প্রশ্ন—একটি রাস্তা কতটা গুরুত্বপূর্ণ হলে মানুষের জীবন-মৃত্যুর সঙ্গেও জড়িয়ে যায়? যেখানে অসুস্থ রোগীকে হাসপাতালে নিতে দুর্ভোগ পোহাতে হয়, আবার মরদেহ কাদাপানির রাস্তা পেরিয়ে বাড়িতে আনতে হয়, সেখানে উন্নয়নের বাস্তব চিত্র সহজেই অনুমেয়।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, বহুবার স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কাছে রাস্তা সংস্কারের দাবি জানানো হলেও এখনো দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। ফলে শিক্ষা, কৃষি, চিকিৎসা ও দৈনন্দিন জীবনে এর নেতিবাচক প্রভাব দিন দিন বাড়ছে।

দীর্ঘদিনের ভোগান্তির পর অবশেষে মঙ্গলবার, ২৬ মে আলাপুর ও পূর্ব লেঞ্জাপাড়া গ্রামের সচেতন এলাকাবাসী নিজ উদ্যোগে প্রায় এক কিলোমিটার রাস্তার বিভিন্ন অংশে রাবিশ ও ইটের আদলা ফেলে চলাচলের উপযোগী করার চেষ্টা করেছেন। স্থানীয়দের সহযোগিতায় প্রায় ৩০ হাজার টাকা ব্যয়ে এই কাজ সম্পন্ন করা হয়। এলাকাবাসী জানান, সরকারি উদ্যোগের অপেক্ষায় না থেকে মানুষের চলাচলের কষ্ট কিছুটা কমাতেই তারা স্বেচ্ছাশ্রম ও অর্থ সংগ্রহের মাধ্যমে এই উদ্যোগ নিয়েছেন। তবে এটি সাময়িক সমাধান হলেও স্থায়ীভাবে দুর্ভোগ নিরসনে দ্রুত রাস্তা পাকা করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা।



শেয়ার করুন