জেলা নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা গেছে, হবিগঞ্জের চারটি আসনে এবার ভোট দেবেন মোট ১৮ লাখ ৩৩ হাজার ৯৬২ জন ভোটার। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৯ লাখ ২৮ হাজার ৬৯৬ জন, নারী ভোটার ৯ লাখ ৫ হাজার ২৪২ জন এবং হিজড়া ভোটার রয়েছেন ২৪ জন। এবারের নির্বাচনে নতুন ভোটার যুক্ত হয়েছেন ১ লাখ ৩২ হাজার ২১৭ জন, যা ভোটের সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র ও কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা : হবিগঞ্জের পুলিশ সুপার মোছা. ইয়াছমিন খাতুন জানান, পূর্ববর্তী নির্বাচনে সহিংসতার ইতিহাস, ভৌগোলিক অবস্থান, যাতায়াত সমস্যা এবং গোয়েন্দা প্রতিবেদনের আলোকে ঝুঁকিপূর্ণ ও অতি ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র চিহ্নিত করা হয়েছে। নিরাপত্তার স্বার্থে কোন কোন কেন্দ্র অতি ঝুঁকিপূর্ণ, তা প্রকাশ করা হচ্ছে না।
তিনি আরও জানান, এসব কেন্দ্রে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি সংখ্যক সশস্ত্র পুলিশ ও আনসার সদস্য মোতায়েন থাকবে। এবার প্রথমবারের মতো প্রিসাইডিং অফিসারদের নিরাপত্তায় সশস্ত্র আনসার দায়িত্ব পালন করবেন। পাশাপাশি ভোটকেন্দ্রগুলোতে সিসি ক্যামেরা এবং পুলিশের বডি ক্যামেরা ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
নির্বাচনী দায়িত্বে হবিগঞ্জ জেলায় থাকবেন ২ হাজার ৪৭ জন পুলিশ সদস্য, দুটি কুইক রেসপন্স টিম, সেনাবাহিনী, বিজিবি, নির্বাহী ও জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট। জেলা নির্বাচন অফিস জানিয়েছে, ঝুঁকির মাত্রা অনুযায়ী প্রতিটি আসনের জন্য আলাদা নিরাপত্তা পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়েছে।
প্রার্থী ও আসনভিত্তিক রাজনৈতিক সমীকরণ : জেলার ৯টি উপজেলা নিয়ে গঠিত চারটি সংসদীয় আসনে এবারের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন মোট ২৪ জন প্রার্থী। এর মধ্যে ২০ জন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের এবং ৪ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী। স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে দুজন বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ায় দলীয় ভোট বিভাজনের আশঙ্কাও আলোচনায় রয়েছে।
হবিগঞ্জ-১ (নবীগঞ্জ-বাহুবল) : এ আসনে বিএনপি প্রার্থী ড. রেজা কিবরিয়ার সঙ্গে মূল লড়াই হবে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী শেখ সুজাত মিয়ার। দুজনেরই নিজস্ব ভোট ব্যাংক রয়েছে এবং দলীয় বিভক্তি এখানে ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। এখানে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী মাওলানা সিরাজুল ইসলাম মিরপুরী। রেজা কিবরিয়া ও সুজাতের ভোটে তিনিও ভাগ বসাতে পারেন।
হবিগঞ্জ-২ (বানিয়াচং-আজমিরীগঞ্জ) : এ আসনে বিএনপি প্রার্থী, মরহুম বেগম খালেদা জিয়ার সাবেক রাজনৈতিক উপদেষ্টা ডা. সাখাওয়াত হাসান জীবনের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মাঠে রয়েছেন খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় আমির মাওলানা আব্দুল বাছিত আজাদ। ধর্মীয় ভোট এবং দলীয় সমর্থনের হিসাব এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এ ছাড়া স্বতন্ত্র হিসেবে রয়েছে সাংবাদিক আফসার আহমেদ রূপক।
হবিগঞ্জ-৩ (হবিগঞ্জ সদর-লাখাই-শায়েস্তাগঞ্জ) : জেলার একমাত্র তিন উপজেলা নিয়ে গঠিত এই আসনে বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক জি কে গউছ প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামের প্রার্থী কাজী মহসিন আহমেদ ও ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী মহিব উদ্দিন আহমেদ সোহেল এবং সুন্নী জোটের ডাঃ এসএম সরোয়ার। এখানে ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা হলেও বিএনপি প্রার্থী এগিয়ে আছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
হবিগঞ্জ-৪ (চুনারুঘাট-মাধবপুর) : চা শ্রমিক অধ্যুষিত এই আসনে রয়েছে ২৪টি চা বাগান। ঐতিহাসিকভাবে চা শ্রমিকদের ভোটই এখানে জয়-পরাজয়ের মূল চাবিকাঠি। এবারে বিএনপি প্রার্থী এস.এম. ফয়সল, খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় মহাসচিব আহমদ আবদুল কাদের এবং বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের প্রার্থী আলোচিত বক্তা গিয়াস উদ্দিন তাহেরীর মধ্যে ত্রিমুখী লড়াই হচ্ছে। এখানে একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী রয়েছেন।
ভোটের প্রবণতা ও অতীত ইতিহাস : সাধারণ ভোটারদের মতামত ও মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি বিশ্লেষণে চারটি আসনেই বিএনপি প্রার্থীরা এগিয়ে আছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে বিদ্রোহী প্রার্থী, ধর্মভিত্তিক দলগুলোর প্রভাব এবং নতুন ভোটারদের অংশগ্রহণ ফলাফলকে অনিশ্চিত করে তুলতে পারে।
উল্লেখ্য, স্বাধীনতার পর থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত হবিগঞ্জ-১ আসনে বিএনপি ১ বার, আওয়ামী লীগ ৪ বার, জাতীয় পার্টি ১ বার এবং জাসদ ১ বার জয় লাভ করে। হবিগঞ্জ-২ আসনে বিএনপি ১ বার, আওয়ামী লীগ ৪ বার এবং জাতীয় পার্টি ২ বার জয়ী হয়। হবিগঞ্জ-৩ আসনে বিএনপি ১ বার, আওয়ামী লীগ ৪ বার, জাতীয় পার্টি ১ বার এবং ন্যাপ ১ বার জয় পায়। হবিগঞ্জ-৪ আসনে বিএনপি ১ বার, আওয়ামী লীগ ৪ বার এবং জাতীয় পার্টি ২ বার জয় লাভ করে।
সব মিলিয়ে, নিরাপত্তা ঝুঁকি, প্রার্থী সমীকরণ, বিদ্রোহী প্রভাব ও নতুন ভোটারদের উপস্থিতিতে হবিগঞ্জের চারটি আসনের ফলাফল নিয়ে কৌতূহল চরমে। শেষ পর্যন্ত সব হিসাব-নিকাশের চূড়ান্ত উত্তর মিলবে ১২ ফেব্রুয়ারি, ব্যালট বাক্স খোলার পরই।
