হাওরের পানিবন্দি ধান ॥ ভেজা ফসলেই পুরো বছরের খোরাকির লড়াই কৃষকের

হবিগঞ্জের হাওরাঞ্চলে এবারের বোরো মৌসুমে কৃষকের স্বপ্নে বড় ধাক্কা দিয়েছে অকাল বৃষ্টি ও ঢলের পানি। যে মাঠগুলো একসময় সোনালি ধানে ভরে উঠেছিল, সেগুলো এখন অনেকটাই পানির নিচে তলিয়ে আছে। ফলে ফসল ঘরে তোলার বদলে কৃষককে এখন ভেজা ও নষ্ট হয়ে যাওয়া ধান নিয়ে নতুন করে সংগ্রামে নামতে হচ্ছে। কিছু কৃষক আংশিকভাবে ধান কাটতে পারলেও অধিকাংশ জমির ফসল এখনো পানির নিচেই রয়ে গেছে। যেটুকু ধান কেটে আনা সম্ভব হয়েছে, তার বড় অংশই ভিজে নষ্ট হয়ে গেছে। তবুও বছরের খাদ্যের নিশ্চয়তা ধরে রাখতে এসব ধান শুকানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন কৃষকেরা। কোথাও রাস্তার পাশে, কোথাও বাড়ির উঠানে কিংবা খোলা খলায় ধান ছড়িয়ে দিয়ে তারা রোদের অপেক্ষায় সময় পার করছেন।

বুধবার (৬ মে) রোদের দেখা পাওয়ায় কৃষকদের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরে আসে। সকাল থেকেই পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ভেজা ধান শুকানোর কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন তারা। তবে বাস্তবতা হলো, অধিকাংশ ধানই আগেই পচে যাওয়ায় তা পুরোপুরি খাওয়ার উপযোগী করে তোলা কঠিন হয়ে পড়েছে।

একই এলাকার সুবিদপুর গ্রামের জিতেন্দ্র সরকার বলেন, দুই কেদার জমির ধান কাটা সম্ভব হলেও টানা বৃষ্টির কারণে তা শুকাতে না পারায় অনেকটাই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এখন তাদের মূল লক্ষ্য শুধু পরিবারের জন্য অন্তত কিছুটা খাদ্য নিশ্চিত করা।

আজমিরীগঞ্জ উপজেলার জলসুখা গ্রামের কৃষক গাজিউর রহমান বলেন, প্রকৃতির ওপর মানুষের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। কয়েকদিন সময় পেলে অনেক ধানই রক্ষা করা যেত। কিন্তু এখন অনেক ধান পানির নিচে থেকে পচে যাচ্ছে, আবার কোথাও চারা গজিয়ে যাচ্ছে, ফলে সেগুলো আর কোনো কাজে আসছে না।

হবিগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে বোরো ধান আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল এক লাখ ২৩ হাজার ৮৪৮ হেক্টর জমিতে। আবাদ হয়েছে এক লাখ ২৩ হাজার ৬৪৪ হেক্টর জমিতে। তবে এখন পর্যন্ত প্রায় ১১ হাজার ৬৫২ হেক্টর জমির ফসল পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অধিদপ্তরের উপপরিচালক (উদ্যান) দ্বীপক কুমার পাল জানান, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। দ্রুতই তা সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হবে এবং পরবর্তী সহায়তা নিয়ে সিদ্ধান্ত আসবে।

হাওরের কৃষকদের জন্য এবারের মৌসুম তাই একদিকে ক্ষতির গল্প, অন্যদিকে বেঁচে থাকার লড়াই। পানির নিচে হারানো ফসলের কষ্ট আর সামান্য রোদের আশায় ভেজা ধান শুকানোর চেষ্টা মিলিয়ে কৃষকের দিন কাটছে টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে।



শেয়ার করুন