আগাম বন্যা ঠেকাতে ৩’শ ৩ কিলোমিটার নদী খনন ॥ স্বস্তির আশায় হবিগঞ্জের কৃষক

হাওর অঞ্চলে প্রতিবছর আগাম বন্যার কারণে বোরো ধান তলিয়ে গিয়ে কৃষকের ব্যাপক ক্ষতির প্রেক্ষাপটে ৩০৩ কিলোমিটার নদী খননের একটি বড় প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রকল্পটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে হবিগঞ্জসহ সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জ জেলার হাওর এলাকার জন্য, যেখানে বছরের একমাত্র ফসল ঘরে তোলার আগেই প্রায় নিয়মিতভাবে পানিতে ডুবে যায় ধান। পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (বাপাউবো) প্রস্তাবিত এই প্রকল্পের নাম “হাওর এলাকায় আগাম বন্যা ও সমন্বিত পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন (প্রথম পর্যায়)”। প্রকল্পটি এখন প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) যাচাই-বাছাই পর্যায়ে রয়েছে। আগামী সভায় এটি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। হাওরের কৃষিজমি দেশের খাদ্য উৎপাদনের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হলেও ভৌগোলিক অবস্থান এবং উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে এই অঞ্চলটি প্রতি বছরই ঝুঁকির মুখে থাকে। বিশেষ করে মার্চ-এপ্রিল মাসে যখন বোরো ধান কাটার প্রস্তুতি চলতে থাকে, ঠিক সেই সময় হঠাৎ পানি ঢুকে ফসল তলিয়ে যাওয়ার ঘটনা পুনরাবৃত্তি ঘটছে। চলতি মৌসুমেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। হবিগঞ্জসহ বিভিন্ন হাওর এলাকায় হাজার হাজার হেক্টর জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে, যার একটি বড় অংশ সম্পূর্ণভাবে নষ্ট হয়েছে বলে স্থানীয় কৃষি বিভাগ জানিয়েছে।

এই পরিস্থিতি কৃষকের জীবনে শুধু ক্ষতির নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক চাপও তৈরি করছে। অনেক কৃষক ঋণ নিয়ে চাষাবাদ করেন, কিন্তু ফসল নষ্ট হয়ে যাওয়ায় সেই ঋণ পরিশোধ করতে না পেরে দারিদ্র্যের চক্রে পড়ে যাচ্ছেন। একই সঙ্গে জাতীয় খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থার ওপরও চাপ সৃষ্টি হচ্ছে, কারণ উৎপাদন কমে গেলে বাজারে সরবরাহ সংকট তৈরি হয় এবং এর প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের ওপর।

এই বাস্তবতায় সরকার ১৩টি নদী খনন ও পানি ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের মাধ্যমে হাওর অঞ্চলের আগাম বন্যা নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নিয়েছে। প্রস্তাবিত প্রকল্প অনুযায়ী মোট ৩০৩ দশমিক ৫৮ কিলোমিটার নদী খনন করা হবে, পাশাপাশি ১২ কিলোমিটার খাল পুনঃখনন করা হবে। এর মাধ্যমে প্রায় ১ লাখ ৬৫ হাজার হেক্টর কৃষিজমিকে আগাম বন্যার ঝুঁকি থেকে রক্ষা করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রায় ১৫ লাখ টন বোরো ধান রক্ষা সম্ভব হবে বলে প্রকল্প প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রকল্পটি ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে শুরু হয়ে ২০২৯ সালের জুন পর্যন্ত বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড। মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১৪২৯ কোটি ৮৪ লাখ টাকা, যার বড় অংশই নদী খনন কার্যক্রমে ব্যয় হবে। প্রকল্পের প্রায় ৮৭ শতাংশ অর্থই এই খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এছাড়া ডুবন্ত বাঁধ শক্তিশালীকরণ, ফ্লাড ফিউজ নির্মাণ এবং অবকাঠামো উন্নয়নের জন্যও অর্থ বরাদ্দ রয়েছে।

তবে এই ব্যয় কাঠামো নিয়ে ইতোমধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। পরিকল্পনা কমিশনের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, প্রতি ঘনমিটার খননের ব্যয় তুলনামূলকভাবে বেশি, যা অন্যান্য সমজাতীয় প্রকল্পের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এছাড়া খননকৃত মাটি কোথায় এবং কীভাবে ব্যবস্থাপনা করা হবে, প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়সীমা কেন পরিবর্তন করা হয়েছে এবং আগের তুলনায় উপজেলা সংখ্যা ও এলাকা পরিবর্তনের যৌক্তিকতা নিয়েও ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাওরের সমস্যাকে শুধুমাত্র নদী খননের মাধ্যমে স্থায়ীভাবে সমাধান করা সম্ভব নয়। কারণ এটি একটি সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনার বিষয়। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখা, পলি ব্যবস্থাপনা, হিজল-করচ বন সংরক্ষণ এবং আধুনিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা না থাকলে আগাম বন্যার ঝুঁকি পুরোপুরি কমবে না। তাদের মতে, অবকাঠামোগত উন্নয়ন জরুরি হলেও ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা দূর না হলে প্রকল্পের কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন হবে।

হবিগঞ্জসহ হাওরাঞ্চলের কৃষকেরা এই প্রকল্পকে আশার আলো হিসেবে দেখছেন। তারা মনে করছেন, যদি নদী ও খালগুলো সঠিকভাবে খনন ও সংস্কার করা যায়, তাহলে পানি দ্রুত নেমে যাবে এবং ধান কাটা মৌসুমে ফসল রক্ষা করা সম্ভব হবে। এতে কৃষকের ক্ষতি কমবে এবং খাদ্য উৎপাদনেও স্থিতিশীলতা আসবে। তবে তারা একই সঙ্গে দ্রুত ও স্বচ্ছ বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন, যাতে প্রকল্পটি দীর্ঘসূত্রিতা বা অনিয়মের শিকার না হয়।

সব মিলিয়ে হাওর অঞ্চলের কৃষিজমি রক্ষায় প্রস্তাবিত এই প্রকল্পটি গুরুত্বপূর্ণ একটি উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে এর সফলতা নির্ভর করবে সঠিক পরিকল্পনা, স্বচ্ছ বাস্তবায়ন এবং কার্যকর তদারকির ওপর। বিশেষ করে হবিগঞ্জসহ ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলোর মানুষ এখন তাকিয়ে আছে বাস্তব পরিবর্তনের দিকে, যা তাদের প্রতি বছরের অনিশ্চয়তা কিছুটা হলেও কমাতে পারে।


শেয়ার করুন