জানা গেছে, জলাবদ্ধতা নিরসন, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং অতিদরিদ্র জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে মুড়িয়াউক ইউনিয়নে দুটি খাল পুনঃখনন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়।
এর মধ্যে সাতাউক উত্তর গ্রাম থেকে বলভদ্র নদী পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ৪ কিলোমিটার খাল পুনঃখননের জন্য ১ কোটি ২৪ লাখ ৪৯ হাজার ৮৮৯ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এর মধ্যে শ্রমিক মজুরি বাবদ প্রায় ৫৯ লাখ ৪০ হাজার টাকা ব্যয়ে ২৯৭ জন শ্রমিকের ৪০ দিন কাজ করার কথা রয়েছে।
অন্যদিকে সুতাং নদী থেকে তেঘরিয়া পর্যন্ত প্রায় ২ কিলোমিটার মুড়িয়াউক খাল পুনঃখনন প্রকল্পে ৯৯ লাখ ৫১ হাজার ৯১০ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এতে ৪৭ লাখ ৬০ হাজার টাকা ব্যয়ে ২৯৮ জন শ্রমিকের ৪০ দিন কাজ করার কথা।
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্পে কাগজে-কলমে নির্ধারিত সংখ্যক শ্রমিক দেখানো হলেও বাস্তবে অনেক কম শ্রমিক দিয়ে কাজ করানো হচ্ছে। অনেক শ্রমিক নিয়মিত কাজে উপস্থিত না থেকেও তাদের নামে হাজিরা দেখানো হচ্ছে। নির্ধারিত পরিমাণ মাটি খনন না করেই কাজ সম্পন্ন দেখানোর চেষ্টাও করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে নেওয়া সরকারি প্রকল্পে প্রকৃত উপকারভোগীরা বঞ্চিত হচ্ছেন। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি সরকারি অর্থ অপচয়ের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সূত্র জানায়, সাতাউক ও মুড়িয়াউক খাল পুনঃখনন প্রকল্পের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মুড়িয়াউক ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নোমান মিয়া এবং প্যানেল চেয়ারম্যান আলা উদ্দিন। প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্বে রয়েছে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিস।
তবে প্রকল্পের অগ্রগতি ও শ্রমিকদের কর্মদিবস নিয়ে চেয়ারম্যান এবং উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার বক্তব্যে স্পষ্ট অসঙ্গতি দেখা গেছে।
ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও প্রকল্প সভাপতি নোমান মিয়া দাবি করেন, সাতাউক খালের কাজ শতভাগ সম্পন্ন হয়েছে এবং সেখানে শ্রমিকরা প্রায় ৩৫ দিন কাজ করেছেন। অপরদিকে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম রাকিব জানান, ওই খালের কাজের অগ্রগতি ৮৬ শতাংশ এবং শ্রমিকরা ৩৪ দিন কাজ করেছেন।
মুড়িয়াউক খালের ক্ষেত্রেও চেয়ারম্যানের দাবি, সেখানে ৩৮ দিন কাজ হয়েছে। তবে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটির অগ্রগতি ৮১ শতাংশ এবং শ্রমিকরা ৩৮ দিন কাজ করেছেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, মুড়িয়াউক খালের কাজ কয়েকদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। সেখানে উপস্থিত শ্রমিকরা জানান, টানা বৃষ্টির কারণে ৪ থেকে ৫ দিন ধরে কাজ বন্ধ রয়েছে। তবে কয়েকজন শ্রমিক দাবি করেন, তারা ৪০ থেকে ৪৫ দিন পর্যন্ত কাজ করেছেন।
অন্যদিকে সাতাউক খালের কাজ চলমান থাকার দাবি করা হলেও সরেজমিনে সেখানে কোনো শ্রমিককে কাজ করতে দেখা যায়নি। দুপুরে খাল থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে কয়েকজন নারী শ্রমিক জানান, সকালে কাজে গেলেও প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা তাদের বলেছেন কাজ শেষ হয়ে গেছে। ফলে তারা কিছুক্ষণ অবস্থান করে বাড়ি ফিরে যান।
এক নারী শ্রমিক বলেন, “আমরা সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১২টা বা ১টা পর্যন্ত কাজ করি।”
আরেক নারী শ্রমিক স্বীকার করেন, তার স্বামীর পরিবর্তে তিনি কাজ করছেন। অন্য এক শ্রমিক জানান, চার-পাঁচ দিন পরপর প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে লোক এসে হাজিরা নিয়ে যায়।
এ সময় শ্রমিক উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুললে প্রকল্প সভাপতির এক প্রতিনিধি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন বলেও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান।
অভিযোগের বিষয়ে চেয়ারম্যান নোমান মিয়া বলেন, “কাজ সঠিকভাবেই সম্পন্ন হয়েছে। সাতাউক খালের কাজ শতভাগ শেষ হয়েছে। সেখানে প্রায় ৩৫ দিন শ্রমিকরা কাজ করেছেন। মুড়িয়াউক খালে ৩৮ দিন কাজ হয়েছে। বৃষ্টির পর অবশিষ্ট কাজ শেষ করা হবে।”
অন্যদিকে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম রাকিব বলেন, “সাতাউক খালের ৮৬ শতাংশ এবং মুড়িয়াউক খালের ৮১ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। শ্রমিকদের কাজে কিছু ঘাটতি ও তদারকির সমস্যা রয়েছে। এই কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য নিম্নআয়ের মানুষের হাতে কিছু অর্থ পৌঁছে দেওয়া। হাজিরা অনুযায়ী তাদের মজুরি পরিশোধ করা হবে।”
তিনি আরও স্বীকার করেন, অনেক ক্ষেত্রে শ্রমিকরা নির্ধারিত পরিমাণ কাজ করেন না এবং একজনের পরিবর্তে অন্যজন কাজ করার ঘটনাও ঘটে।
এদিকে স্থানীয় সচেতন মহল প্রকল্প দুটিতে বরাদ্দকৃত সরকারি অর্থের স্বচ্ছ ব্যবহার নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে প্রকৃত শ্রমিকদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত এবং অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
